ছায়াশরীর: শূন্যতার প্রতিধ্বনি পর্ব ৫: সংক্রমণের শুরু
ছায়াশরীর: শূন্যতার প্রতিধ্বনি
ছায়াশরীরপর্ব ৫: সংক্রমণের শুরু
শহরের কৃত্রিম কোলাহল অয়নের কানে এখন সমুদ্রের গর্জনের মতো শোনায়। চারদিকের ব্যস্ত মানুষ, ঝলমলে নিয়ন আলো আর যান্ত্রিক শব্দ—সবকিছুই কেমন যেন অবাস্তব, যেন কোনো সস্তা থিয়েটারের মঞ্চসজ্জা। পুলিশ কমিশনারের অফিস থেকে বের হয়ে আসার সময় অয়নের পা দুটো বারবার টলে যাচ্ছিল। কমিশনার যখন গম্ভীর মুখে জানালেন যে, পুলিশ বাহিনী কালীগঞ্জে গিয়ে কেবল এক ধু-ধু প্রান্তর আর জং ধরা মাইলপোস্ট পেয়েছে, তখন অয়নের মাথার ভেতর সেই বৃদ্ধের অট্টহাসিটা ড্রামের মতো বাজতে শুরু করল। সে কি তবে উন্মাদ হয়ে যাচ্ছে? নাকি সে এমন এক সত্যের লুপে আটকে গেছে যা আধুনিক বিজ্ঞানের সংজ্ঞায় পড়ে না?
অয়ন তার ছোট অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে এসে দরজাটা ভেতর থেকে তিনটি ভারী তালা দিয়ে বন্ধ করল। জানালার পর্দাগুলো টেনে দিয়ে পুরো ঘরকে বাইরের জগত থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিল সে। তার বারবার মনে হচ্ছে, প্রতিটা অন্ধকার কোণ থেকে কোনো এক মুখহীন অবয়ব তাকে নিরন্তর পর্যবেক্ষণ করছে। সে কাঁপাকাঁপা হাতে তার ল্যাপটপটা খুলল। সেই ছবিটি এখনও স্ক্রিনে স্থির হয়ে আছে—অয়ন নিজে, তার ঠিক পেছনে আসিফ, আর আসিফের ঘাড়ের ওপর সেই বরফশীতল কালচে হাত। কিন্তু অয়ন লক্ষ্য করল, ছবিটি স্থির নেই; ওটা যেন প্রতি মিনিটে সামান্য করে বদলে যাচ্ছে। ছবিতে আসিফের মুখটা আগের চেয়ে আরও ফ্যাকাশে, আরও মৃত মনে হচ্ছে, আর তার চোখের মণিগুলো যেন ক্রমশ কোটরের ভেতরে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।
হঠাৎ অয়নের ড্রয়িংরুমের কোণে রাখা পুরনো ল্যান্ডফোনটা বেজে উঠল। এই ফোনটা গত তিন বছর ধরে অকেজো, এটার সংযোগও বিচ্ছিন্ন। আতঙ্কে অয়নের মেরুদণ্ড দিয়ে এক বরফশীতল স্রোত বয়ে গেল। সে যেন এক ঘোরের মধ্যে রিসিভারটা কানে তুলল। ওপাশ থেকে প্রথমে কোনো শব্দ এল না, কেবল এক গভীর, ভারী দীর্ঘশ্বাসের শব্দ। কয়েক সেকেন্ডের এক অসহ্য নিস্তব্ধতা ভেঙে একটি পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল—আসিফের কণ্ঠ।
"অয়ন, তুই কি ভেবেছিস ওখান থেকে পালিয়ে এসে তুই মুক্ত হয়ে গেছিস?" আসিফের কণ্ঠে কোনো মানবিক আবেগ নেই, আছে কেবল ধাতব কাঠিন্য। "কালীগঞ্জ কোনো মানচিত্রের জায়গা নয় রে অয়ন, কালীগঞ্জ একটা সংক্রমণ। তুই অলরেডি সেই ছায়াশরীরের বিষ তোর রক্তে নিয়ে শহরে ঢুকেছিস। তুই নিজেই এখন সেই ভাইরাস।"
অয়ন চিৎকার করে উঠল, "আসিফ! তুই তো ওখানে সেই আগুনেই শেষ হয়ে গেছিস! আমি নিজের চোখে তোকে কঙ্কাল হতে দেখেছি!"
"যা দেখেছিস তা ছিল ছায়া, অয়ন। আসল শরীর তো এখন তোর আয়নায়।" ওপাশ থেকে এক পৈশাচিক খিলখিল হাসির শব্দ ভেসে এল এবং সাথে সাথেই ফোনের লাইনটা মৃত মানুষের মতো স্তব্ধ হয়ে গেল।
অয়ন ধীর পায়ে, ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে তার ড্রেসিং টেবিলের বিশাল আয়নাটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আয়নার ওপর হালকা কুয়াশার মতো এক রহস্যময় আস্তরণ জমে আছে। সে হাত দিয়ে ধুলো আর কুয়াশা মুছতেই দেখল, আয়নায় তার নিজের প্রতিবিম্বের ঠিক পেছনে কেউ একজন ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এবার সেটা আসিফ নয়; সেটা ছিল অয়নের নিজেরই এক অবিকল প্রতিরূপ। তবে সেই প্রতিরূপের চোখ নেই, কেবল দুটো কয়লার মতো অন্ধকার গর্ত। আয়নার ভেতরের সেই অন্য অয়ন তার দিকে তাকিয়ে এক বীভৎস হাসি হাসল এবং হঠাৎ কাঁচের ভেতর থেকে হাত বাড়িয়ে অয়নের গলা টিপে ধরার চেষ্টা করল।
অয়ন ছিটকে সরে এল। আয়নাটা মাঝখান থেকে চুরমার হয়ে ভেঙে মেঝেতে আছড়ে পড়ল। কিন্তু ভাঙা কাঁচের প্রতিটি ক্ষুদ্র টুকরোয় অয়ন দেখল সেই মুখহীন নারী আর লণ্ঠন হাতে বৃদ্ধের প্রতিচ্ছবি। তারা যেন শত শত খণ্ডে বিভক্ত হয়ে তাকে চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে। অয়ন বুঝতে পারল, সে যে এই শহরে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ফিরে এসেছে, এটা আসলে আসিফেরই একটা চাল ছিল। সে একা আসেনি, সে তার সাথে করে নিয়ে এসেছে কালীগঞ্জের সেই অভিশপ্ত তেরো মাইলের রেশ। তার পকেটে থাকা মেমোরি কার্ডটি বের করে মেঝেতে রাখল সে। কার্ডটি এখন আর সবুজ নেই; ওটা পুড়ে কয়লার মতো কালো হয়ে গেছে এবং ওটা থেকে পচা মাংস পোড়া গন্ধযুক্ত ধোঁয়া বের হচ্ছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো। অত্যন্ত ধীর, নিয়ন্ত্রিত এবং ছন্দময় শব্দ— 'ঠক... ঠক... ঠক'। অয়ন দরজার 'আই-হোল' দিয়ে বাইরে উঁকি মারল। করিডোরটা জনশূন্য, কেবল সিলিংয়ের আলোটা অস্বাভাবিকভাবে দপদপ করছে। কিন্তু মেঝের দিকে তাকাতেই অয়নের শরীরের পশম খাড়া হয়ে গেল। দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে এক ঘন, কুচকুচে কালো তরল সাপের মতো ঘরের ভেতরে ঢুকছে। সেটা দেখতে রক্তের মতো মনে হলেও তার বর্ণ এবং ঘনত্ব যেন অন্য কোনো জগতের।
অয়ন পাগলের মতো তার বুকশেলফ থেকে বাবার পুরনো ডায়েরিটা খুঁজে বের করল। তার মনে পড়ল, তার বাবা একজন নৃতাত্ত্বিক গবেষক ছিলেন এবং তিনি একবার গ্রামবাংলার লোকগাথা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে 'ছায়াশরীর' নিয়ে কিছু রহস্যময় নোট লিখেছিলেন। ডায়েরির হলুদ হয়ে যাওয়া পাতাগুলো উল্টাতে উল্টাতে অয়ন একটা পৃষ্ঠায় এসে থমকে গেল। সেখানে গাঢ় লাল কালিতে বড় করে লেখা আছে— "ছায়াশরীররা তখনই মানুষের জগত দখল করতে পারে, যখন কোনো জীবিত মানুষ তাদের প্রতিবিম্ব বা ছায়া নিজের অবচেতন মনে অথবা কোনো যন্ত্রে বন্দি করে লোকালয়ে নিয়ে আসে। এটি একটি পৈশাচিক সংক্রমণ চক্র, যা প্রতি একশ বছর পর পর পূর্ণতা পায়।"
অয়ন বুঝতে পারল, সে আসলে অজান্তেই এই মহাপ্রলয়ের 'বাহক' বা 'প্যাশেন্ট জিরো' হয়ে গেছে। আসিফ তাকে মারতে চায়নি, বরং আসিফ চেয়েছিল অয়ন যেন ভয় পেয়ে দ্রুত শহরে পালিয়ে যায়, যাতে অয়নের মাধ্যমে এই অশরীরী শক্তিগুলো শহরের লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিড়ে ডালপালা বিস্তার করতে পারে।
সে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। দেখল রাস্তার উল্টোদিকের স্ট্রিটলাইটের নিচে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে সেই লণ্ঠন হাতে বৃদ্ধ। সে মুখ তুলে সরাসরি অয়নের জানালার দিকে তাকাল এবং তার হাতের লণ্ঠনটা একবার শূন্যে দোলাল। সাথে সাথেই পুরো ব্লকের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। অয়নের অ্যাপার্টমেন্ট এখন এক জমাট বাঁধা অন্ধকারের গুহা। সেই অন্ধকারে অয়ন অনুভব করল, তার পেছনের সিটে কেউ নেই ঠিকই, কিন্তু মেঝের ওপর থাকা তার নিজের ছায়াটা হঠাতই মেঝে থেকে আলাদা হয়ে দেয়ালের ওপর জীবন্ত মানুষের মতো দাঁড়িয়ে পড়ছে।
অয়নের নিজের ছায়াই এখন তার সবচাইতে বড় শত্রু। ছায়াটা দেয়াল থেকে নেমে এসে ধীরে ধীরে অয়নের দিকে হাত বাড়িয়ে এগোতে শুরু করল। অয়ন বুঝতে পারল, এই দীর্ঘ লড়াইটা এখন আর কোনো পাহাড়ি রাস্তার নয়; এই লড়াইটা এখন তার নিজের অস্তিত্ব আর নিজের ছায়ার বিরুদ্ধে।
সে কি পারবে তার বাবার ডায়েরির সেই অসমাপ্ত মন্ত্র দিয়ে এই মরণব্যাধি রুখতে? নাকি অয়ন নিজেই হয়ে যাবে শহরের রাজপথের প্রথম ছায়াশরীর?
(৫ম পর্ব সমাপ্ত)
পরবর্তী (৬ষ্ঠ) পর্বে যা ঘটবে:
অয়ন আবিষ্কার করবে যে তার অ্যাপার্টমেন্টের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর ছায়া একে একে উধাও হয়ে যাচ্ছে। তার বাবার ডায়েরিতে থাকা এক সংকেত তাকে নিয়ে যাবে শহরের এক প্রাচীন কবরস্থানে, যেখানে হয়তো লুকিয়ে আছে কালীগঞ্জের এই লুপ ভাঙার আসল চাবিকাঠি।
গল্পটি কেমন লাগলো অবশ্যই কমেন্ট এ জানাবেন।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন