ছায়াশরীর: শ্মশানের মৌন সাক্ষী (পর্ব ৭)

 পর্ব ৭: শ্মশানের মৌন সাক্ষী


ছায়াশরীর


​শহরের রাজপথ এখন আর সেই পরিচিত ব্যস্ততায় নেই; তা এখন এক অপার্থিব কুয়াশায় আচ্ছন্ন। এই কুয়াশা প্রথাগত শীতের জলীয় বাষ্প নয়, বরং এক বিষাক্ত ও ভারী গ্যাসের মতো চারপাশকে গিলে খাচ্ছে, যার ভেতর দিয়ে তাকালে মনে হয় পৃথিবীটা যেন কোনো পুরনো সাদা-কালো স্থিরচিত্র। অয়নের গাড়ি যখন শহরের একবারে নির্জন প্রান্তের সেই প্রাচীন শ্মশানঘাটের দিকে এগোচ্ছিল, তখন তার গাড়ির হেডলাইটের শক্তিশালী আলো সেই জমাট বাঁধা অন্ধকারে বাধা পেয়ে বারবার ফিরে আসছিল। হেডলাইটের আলোতে কুয়াশাগুলো যেন হাজার হাজার ছোট ছায়াশরীর হয়ে নৃত্য করছে। অয়ন রিয়ার ভিউ মিররে বারবার দেখল তার পেছনের সিটে বসা সেই নিশ্চল অবয়বটিকে—তার মা। মা কোনো কথা বলছেন না, তাঁর ঠোঁটের কোণে ঝুলে থাকা সেই ম্লান হাসিতে লুকানো রয়েছে এক অনন্তকাল ব্যাপী বিষাদ। অয়ন বুঝতে পারল, এই মা আসলে কোনো সাধারণ অশরীরী নন, বরং তার নিজের তপ্ত মস্তিস্কের এক অলৌকিক রক্ষাকবচ, যা তাকে এই আসন্ন প্রলয় থেকে মানসিকভাবে স্থির রাখার অন্তিম চেষ্টা করে যাচ্ছে।

​শ্মশানঘাটের লোহার বিশাল গেটটা এক বিভীষিকাময় জং ধরা শব্দে আপনিতেই খুলে গেল। অয়ন গাড়ি থেকে নেমে মাটিতে পা রাখতেই অনুভব করল এখানকার মাটি অস্বাভাবিকভাবে উত্তপ্ত, যেন ভূগর্ভে কোনো এক বিশাল আগ্নেয়গিরি ছটফট করছে। চারপাশের গাছপালাগুলো কোনো মৃত কঙ্কালের মতো শুকনো হাত বাড়িয়ে আকাশের দিকে চেয়ে আছে। তার হাতের মুঠোয় থাকা সেই কালচে পাথরটা এখন প্রচণ্ডভাবে স্পন্দিত হচ্ছে; ওটা আর কোনো জড় পদার্থ নয়, ওটা যেন কোনো এক প্রাচীন দানবের জীবন্ত হৃদপিণ্ড। অয়ন তার পকেট থেকে বাবার ডায়েরির সেই নকশা করা রহস্যময় পৃষ্ঠাটা বের করল। সেখানে বাবার অস্থির হাতের লেখাগুলো এখন চাঁদের আলোয় রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। পাতায় লেখা ছিল এক অমোঘ নির্দেশ:

​"যেখানে সব জাগতিক পথের শেষ, সেখানেই অলৌকিক পথের শুরু। তোমার দাদার নামহীন স্মৃতিস্তম্ভের গভীরেই লুকানো আছে সেই চরম সত্য, যা এক মুহূর্তের জন্য হলেও কালীগঞ্জের পৈশাচিক শক্তিকে স্তব্ধ করে দিতে সক্ষম।"

​শ্মশানের একদম উত্তর কোণে, ঘন ঝোপঝাড় আর লতাগুল্মের আড়ালে অয়ন খুঁজে পেল তার দাদার সেই প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া জরাজীর্ণ স্মৃতিসৌধটি। সেখানে কোনো নামফলক বা পরিচয় চিহ্ন নেই, কেবল কালো পাথরের গায়ে খোদাই করা আছে একটি অদ্ভুত প্রতীক—সেই একই বৃত্ত আর তার ভেতরে রক্তবর্ণ চোখ, যা সে বাবার ডায়েরিতেও দেখেছিল। অয়ন তার হাতের সেই স্পন্দিত কালচে পাথরটা প্রতীকের ঠিক মাঝখানে স্থাপন করল। সাথে সাথে এক বিকট হাড় মড়মড় করার মতো শব্দে স্মৃতিসৌধের পাদদেশ সরে গেল এবং সেখান থেকে নিচ অভিমুখী এক সংকীর্ণ, অন্ধকার সুড়ঙ্গ পথ বেরিয়ে এল।

​সেই সুড়ঙ্গ দিয়ে নিচে নামার সময় অয়ন অনুভব করল এখানকার বাতাসের ঘনত্ব এবং গন্ধ অদ্ভুতভাবে বদলে যাচ্ছে। দেয়ালের গায়ে মশাল জ্বলছে, কিন্তু সেই আগুনের কোনো উত্তাপ নেই; ওটা যেন এক শীতল নীল আলো। সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে সে এক বিশাল গোলাকার ভূগর্ভস্থ কক্ষে এসে পৌঁছাল। কক্ষের ঠিক মাঝখানে একটি বড় পাথরের বেদী, আর তার ওপর অতি যত্নে রাখা এক প্রাচীন চামড়ায় মোড়ানো পান্ডুলিপি। কিন্তু অয়নকে সবচাইতে বেশি চমকে দিল অন্য কিছু—সেই বেদীর একদম পাশে ধুলোর ওপর পড়ে থাকা একটি অতি পরিচিত চশমা। ওটা অয়নের বাবার চশমা! অয়ন বিড়বিড় করে উঠল, "বাবা কি তবে মৃত্যুর আগে এখানে একবার এসেছিলেন? তিনি কি সব জানতেন?"

​হঠাৎ কক্ষের চারদিকের জমাট বাঁধা অন্ধকার থেকে একদল ছায়াশরীর নিঃশব্দে বেরিয়ে এল। তারা প্রত্যেকে হাতে একটি করে জ্বলন্ত লণ্ঠন নিয়ে অত্যন্ত শান্তভাবে অয়নকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরল। তাদের সবার মুখ কুয়াশার মতো অস্পষ্ট, কিন্তু তাদের প্রাচীন পোশাক দেখে অয়ন বুঝতে পারল এরা শহরের সেই সাধারণ মানুষগুলো নয়; এরা সবাই সম্ভবত শতাব্দীকাল ধরে কোনো এক তান্ত্রিক আচারের বলি হওয়া হতভাগ্য আত্মা। ঠিক তখনই এক গম্ভীর এবং কর্কশ কণ্ঠস্বর সেই পাথুরে কক্ষে প্রতিধ্বনিত হলো, "অয়ন, তুই অবশেষে তোর আসল ঠিকানায় পৌঁছে গেছিস। রক্ত যে রক্তের টান এড়াতে পারে না!"

​অয়ন দেখল বেদীর ওপাশ থেকে একজন দীর্ঘদেহী মানুষ ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছেন। তার মুখটা লণ্ঠনের ম্লান আলোয় ঢাকা থাকলেও অয়ন তার কণ্ঠস্বর মুহূর্তেই চিনতে পারল—আসিফ! কিন্তু না, এই আসিফের শরীরে কোনো অগ্নিকাণ্ডের ক্ষত নেই, তার চোখদুটো যেন অন্ধকারের ভেতর দুটো জ্বলন্ত আঙরা। অয়ন গর্জে উঠল, "আসিফ? তুই কীভাবে এখানে জ্যান্ত অবস্থায় এলি? আমি তো তোকে পুড়ে শেষ হতে দেখেছি!"

​"আমি কোনোদিন কালীগঞ্জ ছাড়িনি রে অয়ন, আমি তো কালীগঞ্জেই বাস করি," আসিফ ধীরপায়ে অয়নের দিকে এগিয়ে এল। "তোর কি মনে হয় তোর বাবা হঠাৎ করেই এক সন্ধ্যায় হৃদরোগে মারা গিয়েছিলেন? না। তিনি যখন এই গোপন পান্ডুলিপিটা খুঁজে পেয়েছিলেন এবং বুঝতে পেরেছিলেন যে তোর পরিবারের রক্ত দিয়ে এই ছায়াশরীরদের পুরো সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, তখনই তাকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমি কেবল তাঁর সেই অসমাপ্ত কাজ এখন শেষ করছি মাত্র।"

​আসিফ জানাল, অয়নের দাদা ছিলেন আসলে কালীগঞ্জের সেই অভিশপ্ত জমিদার বাড়ির প্রধান পুরোহিত। অগ্নিকাণ্ডের রাতে তিনি পুরোপুরি গ্রাস হওয়ার আগে একটি পরম শক্তিশালী গোপন মুক্তি-মন্ত্র এই পান্ডুলিপিতে লিখে গিয়েছিলেন। সেই মন্ত্র আর অয়নের দেহের উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত রক্ত—এই দুইয়ের মিলনেই তৈরি হবে এক অজেয় মহাজাগতিক শক্তি, যা দিয়ে মৃত্যুকেও পরাজিত করা সম্ভব। আসিফ সেই অসীম ক্ষমতার লোভে অয়নকে এই গোলকধাঁধায় টেনে এনেছে। "তোর বাবার রক্ত দিয়ে কাজ হয়নি অয়ন, কারণ তিনি এই উত্তরাধিকারকে আমৃত্যু অস্বীকার করতে চেয়েছিলেন," আসিফ পৈশাচিক উল্লাসে হাসতে হাসতে বলতে লাগল। "কিন্তু তুই তো নিজেই ইনভেস্টিগেশন করতে কালীগঞ্জে গিয়েছিস। তুই কৌতূহলবশত নিজেই তোর অবচেতন মনে সেই অন্ধকার বীজ রোপণ করেছিস।"

​অয়ন লক্ষ্য করল, আসিফের ছায়াটা দেয়ালের ওপর এক বিশাল দানবীয় অবয়ব নিচ্ছে। কিন্তু অয়নের হাতের সেই কালচে পাথরটা এখন নীল রঙের পরিবর্তে টকটকে রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। বাবার ডায়েরির সেই অদেখা পরবর্তী পৃষ্ঠায় অয়ন এক নতুন সংকেত খুঁজে পেল। সেখানে লেখা ছিল: "পাথরটি যদি রক্তবর্ণ হয়, জানবে শত্রু তোমার রক্তমাংসের অতি নিকটে অবস্থান করছে। পাথরটি কেবল তোমার ঢাল নয়, এটিই সেই চূড়ান্ত ধ্বংসের চাবিকাঠি।"

​অয়ন মুহূর্তেই বুঝতে পারল, আসিফ আসলে একা নয়; তার শরীরের ভেতর কোনো এক প্রাচীন অতিপ্রাকৃত শক্তি ভর করেছে। সে তার হাতের পাথরটা সর্বশক্তি দিয়ে বেদীর ওপর রাখা সেই পান্ডুলিপির ওপর ছুঁড়ে মারল। সাথে সাথে এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণে পুরো ভূগর্ভস্থ কক্ষটি ভূমিকম্পের মতো কেঁপে উঠল। সেই নীল আগুন আর পাথরের রক্তবর্ণ আলোর প্রচণ্ড সংঘর্ষে চারপাশের ছায়াশরীররা এক অসহ্য যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠল। আসিফ যন্ত্রণায় মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল, কিন্তু তার মুখ থেকে বেরিয়ে এল এক দ্বিতীয় কণ্ঠস্বর—এক অত্যন্ত প্রাচীন এবং ঘড়ঘড়ে আওয়াজ যা কোনো মানুষের হতে পারে না। "তোর রক্তই আমাদের একমাত্র মুক্তি অয়ন! তুই আমাদের অস্বীকার করতে পারবি না, কারণ আমরাই তুই!"

​ঠিক সেই মহাপ্রলয়ের মুহূর্তে অয়ন দেখল, তার পাশে এতক্ষণ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মায়ের অবয়বটি এগিয়ে গিয়ে পান্ডুলিপিটা হাতে তুলে নিল। মা অয়নের দিকে তাকিয়ে শেষবারের মতো করুণ স্বরে বললেন, "অয়ন, এই পান্ডুলিপির দশ নম্বর পাতাটা ছিঁড়ে ফেল। ওখানেই তোর পরিবারের আসল শৃঙ্খল আর মুক্তির চাবিকাঠি লুকানো আছে।"

​অয়ন দ্রুত পান্ডুলিপিটা টেনে নিল। কিন্তু পাতাটা ছিঁড়তে গেলেই সে অনুভব করল তার হাতের তালু থেকে ঝরঝর করে তাজা রক্ত বেরিয়ে আসছে। সেই রক্ত পান্ডুলিপির হলদে পাতায় লাগতেই প্রাচীন অক্ষরগুলো সাপের মতো জীবন্ত হয়ে নড়তে শুরু করল। অয়ন দেখল, তার চারপাশের শ্মশানের কক্ষটি ক্রমশ মিলিয়ে যাচ্ছে। সে আর সেই ভূগর্ভে নেই; সে এখন দাঁড়িয়ে আছে সেই চিরচেনা তেরো মাইলের মাইলপোস্টের ঠিক সামনে। কিন্তু এবার মাইলপোস্টে কোনো তেরো নম্বর লেখা নেই, সেখানে রক্তমাখা হাতে লেখা আছে কেবল একটি শব্দ— 'শুরু'।

​অয়ন বুঝতে পারল, সে এক অনন্ত এবং দীর্ঘ গোলকধাঁধায় প্রবেশ করেছে মাত্র। এই লড়াই কেবল তার প্রথম ধাপটি পার করল। সে এখন আর কোনো সাধারণ সাংবাদিক নয়; সে এখন এক অন্ধকার উত্তরাধিকারের মালিক। সে দূরে কুয়াশার ভেতর দিয়ে দেখল, শত শত লণ্ঠনের আলো আবার তার দিকে এগিয়ে আসছে। তবে এবার তারা আক্রমণ করতে আসছে না, তারা যেন তাকে কোনো এক নতুন এবং ভয়ংকর গন্তব্যের দিকে পথ দেখাচ্ছে। সেই গন্তব্য হলো অয়নের নিজের অজানা অতীত।

​(৭ম পর্ব সমাপ্ত)

​পরবর্তী (৮ম) পর্বে যা ঘটবে:

​অয়ন সেই রক্তমাখা পান্ডুলিপি আর রহস্যময় দশ নম্বর পাতাটি নিয়ে পৌঁছাবে এমন এক নির্জন গ্রামে, যেখানে তার জন্ম হয়েছিল। সেখানে সে দেখা পাবে এক শতায়ু বৃদ্ধার, যিনি গত বিশ বছর ধরে অয়নের ফেরার অপেক্ষায় এক প্রদীপ জ্বালিয়ে বসে আছেন। কিন্তু আসিফ কি সত্যিই ধ্বংস হয়েছে? নাকি সে এখন অন্য কোনো ছদ্মবেশে অয়নের ঠিক পেছনেই অবস্থান করছে?


বিঃদ্রঃ গল্পের লেখার মাঝে ছোট ভুল ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন; সম্ভব হলে মেসেজে জানাবেন। সবশেষে কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না, কেমন লেগেছে আজকের গল্প।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ছায়াশরীর: ধমনীতে কালীগঞ্জ (পর্ব ৬)

রক্ত ছাড়া কথা বলে না কালীগঞ্জের মাটি: অভিশপ্ত মাইলের দ্বিতীয় অধ্যায়