ছায়াশরীর: বিশ্বাসঘাতকের মুখোশ (পর্ব ৪)

​ছায়াশরীর: অভিশপ্ত মাইলের শেষে


                                   ছায়াশরীর

​পর্ব ৪: বিশ্বাসঘাতকের মুখোশ

​অয়ন যখন চোখ মেলল, তার মনে হলো সে কোনো এক আদিম অন্ধকারের গর্ভে আটকা পড়েছে। চারপাশ থেকে ধেয়ে আসা পচা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ আর হাড়কাঁপানো শীতলতা তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছিল যে, সে আর জীবন্ত পৃথিবীর অংশ নেই। ঘুটঘুটে অন্ধকারে হাতড়ে সে তার ভাঙা ডিএসএলআর ক্যামেরাটা খুঁজে পেল। ক্যামেরাটার লেন্সটা চুরমার হয়ে গেছে, ঠিক যেমন অয়নের সাজানো জীবনটা গত কয়েক ঘণ্টায় চুরমার হয়ে গেল।
​কুঠুরির ওপরের এক চিলতে ফোকর দিয়ে আসা ফিকে চাঁদের আলোয় অয়ন যা দেখল, তাতে তার আত্মা শুকিয়ে গেল। পাথুরে দেয়ালে হাজার হাজার মানুষের অবয়ব আঁকা—না, এগুলো ছবি নয়, এগুলো যেন রক্তের ছোপ দিয়ে তৈরি করা একেকটি অতৃপ্ত আত্মার দীর্ঘশ্বাস। হঠাৎ সেই পরিচিত, হাড়হিম করা ফিসফিসানি কুঠুরির দেয়াল ভেদ করে তার কানের কাছে আছড়ে পড়ল— "অয়ন, তুই কি জানিস তোর এই কাল্পনিক তেরো মাইলের যাত্রার আসল স্ক্রিপ্ট রাইটার কে?"
​অয়ন সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করে উঠল, "কে তুমি? সামনে আসো! কাপুরুষের মতো অন্ধকারে লুকিয়ে থেকো না!"
​অন্ধকার চিরে ধীরে ধীরে এক দীর্ঘ অবয়ব বেরিয়ে এল। কোনো পিশাচ নয়, কোনো বীভৎস কঙ্কাল নয়—একদম রক্তমাংসের এক সুবেশধারী মানুষ। তাকে দেখে অয়নের হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে আসিফ—অয়নের সবচাইতে বিশ্বস্ত বন্ধু এবং যে নামী পত্রিকার হয়ে অয়ন এই ইনভেস্টিগেশনে এসেছে, সেই পত্রিকার প্রধান সম্পাদক।
​"আসিফ? তুই এখানে কেন? তুই তো শহরে থাকার কথা!" অয়নের কণ্ঠে অবিশ্বাসের করুণ সুর।
​আসিফ একটা পৈশাচিক হাসি দিল, যে হাসিতে কোনো বন্ধুত্বপূর্ণ উষ্ণতা ছিল না। "তোর কি মনে হয় কালীগঞ্জের এই মিথটা এমনি এমনিই ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়েছে? এই পুরোটা একটা সুপরিকল্পিত জাল ছিল অয়ন। সেই নিখোঁজ ব্যবসায়ী আসলে কোনোদিন এই অভিশপ্ত বাড়ির কারণে হারায়নি; তাকে আমি নিজেই সরিয়ে দিয়েছি। কারণ সে এই জমিদার বাড়ির মাটির নিচে লুকানো কয়েকশ বছরের পুরনো গুপ্তধনের খবর পেয়ে গিয়েছিল।"
​অয়ন স্তব্ধ হয়ে শুনছিল। আসিফ ধীরপায়ে অয়নের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলতে লাগল, "কিন্তু এই গুপ্তধন পাহারা দিচ্ছে সেই প্রাচীন ছায়াশরীররা। তারা মুক্তি চায় না অয়ন, তারা চায় রক্ত। আর চায় এমন এক মাধ্যম, যার মাধ্যমে তারা এই অভিশপ্ত চৌহদ্দি ছাড়িয়ে বাইরের পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়তে পারবে। তুই যখন ওই ক্যামেরা দিয়ে তাদের ছবিগুলো তুলেছিস, তখন তুই আসলে অজান্তেই তাদের আত্মার বাহক হয়ে গিয়েছিস। এখন শুধু তোকে এখানে বলি দিয়ে দিলেই এই গুপ্তধন হবে আমার, আর এই পৃথিবীটা হবে ওই ছায়াশরীরদের নতুন বিচরণভূমি।"
​অয়ন এখন বুঝতে পারল, সেই প্রথম রাত থেকে আসা রহস্যময় ফোন কলগুলো আসলে আসিফই করেছিল। তাকে ভয় দেখিয়ে এই লুপে আটকে রাখা আর তার মনস্তাত্ত্বিক ভারসাম্য নষ্ট করাই ছিল আসিফের মূল লক্ষ্য। আসিফ তার কোট থেকে একটা ধারালো, প্রাচীন ছোরা বের করল। চাঁদের আলোয় ছোরার ফলাটা যখন চকচক করে উঠল, অয়ন লক্ষ করল আসিফের কোনো ছায়া মেঝেতে পড়ছে না! সে কি তবে ইতোমধ্যেই এই দানবদের কাছে নিজের আত্মা বিক্রি করে দিয়েছে?
​ঠিক সেই মুহূর্তে অয়নের মনে পড়ল তার পকেটে থাকা মেমোরি কার্ডটির কথা। সে জানত আসিফ তাকে শেষ করে দেওয়ার আগে অবশ্যই প্রমাণগুলো লোপাট করতে চাইবে। অয়ন এক অদ্ভুত সাহস সঞ্চয় করে তার ভাঙা ক্যামেরাটা তুলে ধরল। "আসিফ, তুই যা খুঁজছিস তা এই ক্যামেরার মেমোরিতে নেই। কার্ডটা আমি আগেই ক্লাউড স্টোরেজে অটো-আপলোড করে দিয়েছি। তুই আমাকে মারলে সারা দুনিয়া ভোর হওয়ার আগেই জেনে যাবে তুই একজন খুনি এবং এই ধ্বংসলীলার মূল কারিগর!"
​আসিফ এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তার চোখেমুখে ফুটে উঠল এক চরম অনিশ্চয়তা। আর সেই সামান্য ভগ্নাংশ সময়কেই অয়ন সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করল। সে কুঠুরির দেয়ালে ঝোলানো পুরনো লণ্ঠনটা আসিফের দিকে লক্ষ্য করে ছুড়ে মারল। লণ্ঠনটা ফেটে কেরোসিনের আগুন মুহূর্তেই শুকনো খড় আর কাঠে ছড়িয়ে পড়ল। সেই লেলিহান শিখার আলোয় ঘরটি যখন আলোকিত হলো, অয়ন এক ভয়ানক দৃশ্য দেখল।
​আসিফের ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে আছে সেই লণ্ঠন হাতে বীভৎস বৃদ্ধ আর সেই মুখহীন নারীটি। তারা এবার অয়নকে নয়, বরং আসিফকে ঘিরে ধরছে। বৃদ্ধটি তার হাড়সর্বস্ব হাত দিয়ে আসিফের গলা এমনভাবে চেপে ধরল যে আসিফের চোখদুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। "তুই আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিস আসিফ! তুই চেয়েছিলি আমাদের ব্যবহার করে একাই ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছাতে?"
​আসিফের গগনবিদারী আর্তনাদ ওই পাথুরে কুঠুরির দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসতে লাগল। অয়ন দেখল আগুনের তাপে দেয়ালের সেই রক্তমাখা ছবিগুলো যেন জীবন্ত হয়ে ছটফট করছে। সে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে ফোকরের সেই সরু পথ দিয়ে কোনোমতে শরীরের চামড়া ছিঁড়ে বাইরে বেরিয়ে এল। বাইরে তখন ভোরের প্রথম ধূসর আলো ফুটছে, কিন্তু সেই আলোয় কোনো স্বস্তি নেই।
​সে পাগলের মতো দৌড়ে তার গাড়ির কাছে পৌঁছাল। গাড়ি স্টার্ট নিতেই সে পেছনে না তাকিয়ে সর্বোচ্চ গতিতে শহর অভিমুখে রওনা হলো। যখন সে কালীগঞ্জের সেই অভিশপ্ত তেরো মাইলের তোরণ পার হচ্ছিল, রিয়ার ভিউ মিররে দেখল পুরো জমিদার বাড়িটি দাউ দাউ করে জ্বলছে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আগুনের কোনো কালো ধোঁয়া নেই, শুধু এক অপার্থিব নীল শিখা আকাশ স্পর্শ করতে চাইছে।
​শহরে ফিরে অয়ন সোজা পুলিশ সদর দপ্তরে গেল। কিন্তু পুলিশ যখন বড় বাহিনী নিয়ে কালীগঞ্জে পৌঁছাল, তারা সেখানে কোনো জমিদার বাড়ি বা আগুনের চিহ্নই পেল না। সেখানে কেবল এক ধু-ধু প্রান্তর আর রাস্তার ধারে একটি পুরনো জং ধরা মাইলপোস্ট পড়ে আছে, যেখানে রক্তবর্ণের অক্ষরে লেখা— 'কালীগঞ্জ: ১৪ মাইল'।
​অয়ন কাঁপাকাঁপা হাতে তার ল্যাপটপ খুলল মেমোরি কার্ডের ভিডিওগুলো চেক করার জন্য। কিন্তু সেখানে কোনো ভিডিও রেকর্ড হয়নি। কেবল একটি স্থির ছবি জমা হয়ে আছে—সেটি অয়নের নিজের ছবি, যেখানে তার পেছনে অস্পষ্ট ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে আসিফ, আর আসিফের ঘাড়ের ওপর নিজের বরফশীতল হাত রেখে হাসছে সেই মুখহীন নারীটি।
​অয়ন বুঝতে পারল, লুপটা শেষ হয়নি। কেবল শুরু হয়েছে এক নতুন বিভীষিকার।

​(চতুর্থ পর্ব সমাপ্ত) ৫ ম পর্ব খুব শীগ্রই আসছে 

গল্পটি ভালো লাগলে অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ছায়াশরীর: ধমনীতে কালীগঞ্জ (পর্ব ৬)

ছায়াশরীর: শ্মশানের মৌন সাক্ষী (পর্ব ৭)

রক্ত ছাড়া কথা বলে না কালীগঞ্জের মাটি: অভিশপ্ত মাইলের দ্বিতীয় অধ্যায়