ছায়াশরীর: আয়নার ওপারে মৃত্যু (পর্ব-৩)
ছায়াশরীর: অভিশপ্ত মাইলের শেষে
ছায়াশরীর
পর্ব ৩: আয়নার ওপারে মৃত্যু
অয়ন দেখল তার হাতে সেই নিখোঁজ ব্যবসায়ীর আংটি পরা কাটা আঙুলটা কাঁপছে। না, এটা কেবল কোনো বিভ্রম নয়। আঙুলটির রক্তে মাখা চামড়াটা কুঁচকে যাচ্ছে, যেন সেটা জীবন্ত হয়ে অয়নের হাতের তালুতে কামড়ে বসতে চাইছে। এক অসহ্য পচা মাংসের উৎকট গন্ধ এখন বাতাসের প্রতিটি কণিকায় মিশে আছে। মাইলপোস্টে রক্ত দিয়ে লেখা সেই 'আরও এক মাইল' যেন এক অনন্ত অন্ধকার গহ্বরের দিকে তাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। অয়ন বুঝতে পারল, সে এখন আর কেবল এক তথ্যানুসন্ধানী সাংবাদিক নয়; সে এখন এক অদৃশ্য মরণফাঁদের প্রধান অভিনেতা।
সে দৌড়াতে শুরু করল। পিচঢালা রাস্তাটা এখন নরম কাদার মতো মনে হচ্ছে। পায়ের নিচে প্রতিটি পদক্ষেপে মনে হচ্ছে কেউ যেন নিচ থেকে তার পা টেনে ধরছে। বনের প্রতিটি গাছ যেন জীবন্ত কঙ্কাল হয়ে হাত বাড়িয়ে তাকে জাপ্টে ধরতে চায়। হঠাতই কুয়াশা সরে গেল আর সে দেখল সামনেই সেই পরিত্যক্ত জমিদার বাড়ির বিশালাকার তোরণ। তবে কয়েক ঘণ্টা আগের জরাজীর্ণ ধ্বংসস্তূপ নয়; তোরণটি এখন আলোকসজ্জায় ঝলমল করছে। ওপরের বারান্দায় কোনো এক পুরনো গ্রামোফোন থেকে হাড়হিম করা এক সুর ভেসে আসছে—সেই সুর যেন কোনো মানুষের কান্নার প্রতিধ্বনি।
তোরণ পেরিয়ে ভেতরে পা রাখতেই অয়ন থমকে গেল। এক বিশাল আসর বসেছে উঠোনের ঠিক মাঝখানে। শত শত মানুষ সারি বেঁধে বসে আছে। তাদের পরনে বিশ শতকের পুরনো ধাঁচের ধবধবে সাদা পোশাক। কিন্তু সেখানে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। কেউ কথা বলছে না, এমনকি কারো চোখের পলকও পড়ছে না। অয়ন অতি সাবধানে তাদের একজনের কাছে এগিয়ে গেল। লণ্ঠনের ম্লান আলোয় সে যা দেখল, তাতে তার শরীরের রক্ত হিম হয়ে গেল। এই মানুষগুলোর কোনো ছায়া নেই! মোমবাতির উজ্জ্বল আলোতেও তাদের পায়ের নিচে কেবল মেঝের রঙই দেখা যাচ্ছে। তারা যেন কেবল শূন্যে ভাসা কিছু অবয়ব।
ঠিক মাঝখানের প্রধান আসনে বসে আছে সেই নিখোঁজ ব্যবসায়ী, যাকে খুঁজতে অয়ন এই নরককুণ্ডে পা রেখেছে। তার শরীরটা আর আগের মতো পোড়া বা ক্ষতবিক্ষত নয়; বরং সে একদম সুস্থ এবং স্বাভাবিক। সে অয়নকে দেখে এক চিলতে হাসি হাসল—যে হাসিতে প্রাণের চেয়ে মৃত্যু বেশি স্পষ্ট।
"এসো অয়ন," ব্যবসায়ীটির কণ্ঠস্বর কোনো মানুষের মতো নয়, যেন কোনো যান্ত্রিক গ্রামোফোন রেকর্ড থেকে ভেসে আসা একঘেয়ে আওয়াজ। "আমরা জানতাম তুমি আসবে। তোমার কাঁধে ঝোলানো ওই ক্যামেরাটা বের করো। আমাদের সবার একটা দলগত ছবি তুলতে হবে। তাহলেই আমরা এই অভিশপ্ত গ্রাম থেকে মুক্তি পাব।"
অয়ন কাঁপাকাঁপা হাতে তার ডিএসএলআর ক্যামেরাটা বের করল। ভিউফাইন্ডারে চোখ রাখতেই তার চিৎকারটা গলার কাছে এসে আটকে গেল। খালি চোখে যাদের সে হাসিখুশি এবং সুবেশধারী মানুষ দেখছিল, ক্যামেরার লেন্সের ভেতর দিয়ে তারা সবাই একেকটা গলিত কঙ্কাল! সাদা রেশমি পোশাকের ভেতর থেকে ঝুলে আছে পচা হাড়, নাড়িভুঁড়ি আর পোকা ধরা মাংস। আর যাকে সে ব্যবসায়ী ভাবছিল, ক্যামেরার ফ্রেমে সে সেই লণ্ঠন হাতে দাঁড়ানো বীভৎস চেহারার বৃদ্ধটি!
অয়নের মস্তিষ্কে বিদ্যুৎচমকের মতো বেজে উঠল সেই রহস্যময় ফোনের সাবধানবাণী— "যাদের দেখছ তাদের বিশ্বাস করো না!"
সে ক্যামেরা নামিয়ে ধীর পায়ে পিছু হটতে লাগল। ঠিক তখনই সেই আসরের শত শত আত্মা একসাথে মাথা ঘুরিয়ে অয়নের দিকে তাকাল। শত শত মানুষের ঘাড় ঘোরানোর সেই হাড় মড়মড় শব্দে পুরো বাড়ির বাতাস ভারী হয়ে উঠল। হঠাৎ সেই বৃদ্ধটি বিকট স্বরে গর্জে উঠল, "ছবি তোলো অয়ন! আমাদের এই অতৃপ্ত আত্মাগুলোকে ওই ফিল্মের নেগেটিভে বন্দি করো! তবেই আমরা এই কালীগঞ্জ ছেড়ে তোমার ওই সাজানো শহরে ছড়িয়ে পড়তে পারব!"
অয়ন মুহূর্তেই আসল সত্যটা বুঝতে পারল। এরা মুক্তি চাইছে না; এরা বিষের মতো সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়তে চাইছে। সে যদি এখন শাটার টিপে ছবি তোলে, তবে এই পৈশাচিক প্রেতাত্মারা তার ক্যামেরার মাধ্যমে বাইরের পৃথিবীতে প্রবেশের রাস্তা পেয়ে যাবে।
ঠিক সেই মুহূর্তে অয়ন অনুভব করল কেউ একজন তার বাম হাতটা শক্ত করে ধরল। সেই মুখহীন নারীটি! কিন্তু এবার অয়ন ভয় পেল না। নারীটির স্পর্শ বরফশীতল হলেও তাতে একটা অব্যক্ত আকুতি ছিল। সে অয়নকে ইশারায় হলের এক কোণে রাখা বিশাল এক কারুকার্যমণ্ডিত আয়নার দিকে নিয়ে গেল। আয়নাটি কয়েক ইঞ্চ পুরু ধুলোয় ঢাকা ছিল, কিন্তু অয়ন সেখানে নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পেল না। তার বদলে আয়নার স্বচ্ছ কাঁচের ভেতর সে দেখল দশ বছর আগের এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের দৃশ্য। এই জমিদার বাড়িতেই এক রাতে কয়েকশ মানুষকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছিল, আর সেই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ছিল এই লালসাগ্রস্ত বৃদ্ধটি।
বৃদ্ধটি এখন তার আসল দানবীয় রূপে অয়নের সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখ থেকে টপটপ করে কুচকুচে কালো রক্ত পড়ছে। সে অয়নের দিকে তার নখওয়ালা হাত বাড়িয়ে তেড়ে এল। অয়ন বুঝতে পারল তার একমাত্র রক্ষা পাওয়ার উপায় হলো তার ক্যামেরার ফ্ল্যাশ। সে মুহূর্তের মধ্যে ক্যামেরার সেটিং বদলে 'ম্যাক্সিমাম পাওয়ার ফ্ল্যাশ' মুডে নিল।
"ছবি তোল!" বৃদ্ধের অট্টহাসি পুরো রাজপ্রাসাদ কাঁপিয়ে দিল।
অয়ন শেষবারের মতো সাহস সঞ্চয় করে ফ্ল্যাশটা জ্বালিয়ে দিল। কিন্তু বৃদ্ধের বীভৎস মুখের দিকে নয়, বরং সেই বিশাল প্রাচীন আয়নাটার দিকে লক্ষ্য করে। আলোর তীব্র প্রতিফলন আয়নায় লেগে শতগুণ শক্তিশালী হয়ে পুরো হলে ছড়িয়ে পড়ল। এক কান ফাটানো আর্তনাদে ফেটে পড়ল চারপাশ। আয়নাটা হাজার টুকরো হয়ে চুরমার হয়ে গেল।
অয়ন দেখল, সেই আলোর ঝিলিক গায়ে লাগতেই ওই কঙ্কালগুলো ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু হঠাৎ মেঝে ফেটে শত শত কালো হাত উঠে এসে অয়নের পা দুটোকে আষ্টেপৃষ্ঠে আঁকড়ে ধরল। অয়ন অন্ধকারের এক অতল গহ্বরে তলিয়ে যেতে যেতে শুনতে পেল সেই বৃদ্ধের ফিসফিসানি— "তোর সময় শেষ অয়ন। চতুর্থ মাইলটাই হবে তোর আসল কবর। তুই কি জানিস তোর ক্যামেরায় অলরেডি আমাদের ছবি উঠে গেছে?"
অয়ন যখন জ্ঞান হারাল, তার চোখের সামনে শেষ দৃশ্য হিসেবে যা ভেসে উঠল তা ছিল আরও ভয়ানক—তার নিজের ক্যামেরাটা মেঝেতে পড়ে আছে, আর ক্যামেরার সেই ছোট এলসিডি স্ক্রিনে কেউ একজন লেন্সের দিক থেকে পৈশাচিক উল্লাসে হাসছে।
(তৃতীয় পর্ব সমাপ্ত)
পরবর্তী পর্বে যা থাকছে:
অয়ন কি তার নিজের ক্যামেরার লেন্সের ভেতর বন্দি হয়ে গেছে? সেই 'চতুর্থ মাইল' আসলে কী? আর অয়নের অতি পরিচিত সেই মানুষটি কে, যে তাকে এই মৃত্যুর ঠিকানায় পাঠিয়েছিল?
গল্পটি ভালো লাগলে অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন