আত্মার প্রেম (দ্বিতীয় পর্ব) | শিউরে ওঠা প্রতিশোধ

দ্বিতীয় পর্ব: আত্মার প্রেম


​বাসর ঘরের আলো-আঁধারিতে অবন্তী দেখল সায়েম সোফার ওপর সোজা হয়ে বসে আছে। তার সেই উপড়ে ফেলা চোখের কোটর থেকে কালো অন্ধকার উপচে পড়ছে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সায়েম নড়ছে না, অথচ তার গলা দিয়ে অমির কণ্ঠস্বর অনর্গল বেরিয়ে আসছে।
​অমি সায়েমের মুখ দিয়ে বলছে, "অবন্তী, তোমার কি মনে আছে সেই দিনটার কথা? যেদিন তোমার বাবা আমার বুকে পা দিয়ে বলেছিলেন—গরিবের রক্তের কোনো দাম নেই? আজ দেখো, সেই দামি রক্তের বন্যায় এই রাজপ্রাসাদ ডুবে যাচ্ছে।"
​অবন্তী ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে দেয়ালের সাথে মিশে গেল। তার চিৎকার করার শক্তিটুকুও হারিয়ে গেছে। সে লক্ষ্য করল, সায়েমের হাতগুলো ধীরে ধীরে নীল হয়ে যাচ্ছে এবং নখগুলো অস্বাভাবিক লম্বা আর ধারালো হয়ে উঠছে। সায়েম হঠাৎ খিকখিক করে হেসে উঠল, সেই হাসিতে মানুষের কোনো রেশ নেই।
​ঠিক সেই সময় নিচতলায় পুলিশের সাইরেনের শব্দ শোনা গেল। আকমল খন্দকারের অন্তর্ধান এবং ড্রয়িংরুমে পাওয়া সেই কাদা মাখা জুতো নিয়ে বাড়িতে তখন লঙ্কাকাণ্ড চলছে। ইনস্পেক্টর জামান সাহেব হন্তদন্ত হয়ে দোতলায় উঠে এলেন। তার সাথে ছিল আকমল খন্দকারের প্রধান দেহরক্ষী কাসেম।
​কাসেম ঘরে ঢুকেই সায়েমকে ওভাবে বসে থাকতে দেখে থমকে দাঁড়াল। সে-ই অমিকে মারার সময় প্রথম আঘাতটা করেছিল। সায়েমের (বা অমির) চোখহীন কোটরগুলো যেন কাসেমের ওপর স্থির হয়ে গেল।
​হঠাৎ ঘরের সব কটা জানালার কাঁচ একসাথে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। ইনস্পেক্টর জামান কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখলেন, কাসেমের শরীরটা অদৃশ্য কোনো শক্তিতে শূন্যে উঠে যাচ্ছে। কাসেমের গলাটা যেন কেউ লোহার হাত দিয়ে টিপে ধরেছে। তার চোখগুলো ঠেলে বেরিয়ে আসছিল। অমি সায়েমের মাধ্যমে বলে উঠল, "কাসেম, মনে পড়ে সেই শিমুল গাছটার তলার কথা? তুই যখন আমার পা দুটো ভেঙে দিয়েছিলি, আমি তখন চিৎকার করতে পারিনি। আজ তোর পালা।"
​মুহূর্তের মধ্যে কাসেমের শরীরটা জানালার ভাঙা কাঁচের ওপর আছড়ে পড়ল। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তার শরীর থেকে এক ফোঁটা রক্তও বের হলো না। সেখান থেকে বের হতে লাগল এক ধরণের বিষাক্ত কালো ধোঁয়া। ইনস্পেক্টর জামান ভয়ে নিজের সার্ভিস রিভলভার বের করলেন, কিন্তু দেখলেন বন্দুকের নলটা মোমের মতো গলে নিচে পড়ে যাচ্ছে।
​অমি এবার অবন্তীর দিকে এগিয়ে এল। তার কণ্ঠস্বর হঠাৎ বদলে গেল, আগের মতো নরম আর মায়াবী হয়ে উঠল। সে ফিসফিস করে বলল, "ভয় পেও না অবন্তী। আমি তোমার কোনো ক্ষতি করব না। আমি শুধু আমার প্রাপ্যটা নিতে এসেছি। আকমল খন্দকার একাই আমার খুনি নন। রাজনীতির এই বিষবৃক্ষে সায়েমের বাবা আর জহির সাহেবও জল ঢেলেছিলেন। তারা এখন কোথায় জানো?"
​অবন্তী কাঁপা গলায় বলল, "কোথায়?"
​সায়েমের হাতটা অবন্তীর কপালে ঠেকিয়ে অমি বলল, "এই বাড়ির ঠিক নিচেই যে পুরনো বেজমেন্ট আছে, সেখানে তোমার বাবা তার সব কালো টাকা লুকিয়ে রাখতেন। আজ সেখানে টাকা নেই, আছে শুধু একরাশ পচা মাংসের গন্ধ। তারা সেখানেই আমার জন্য অপেক্ষা করছে।"
​বলতে বলতেই সায়েমের দেহটা মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। ঘরের কোণে একটা ছায়া ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। অবন্তী দেখল ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় অমির মুখটা মুহূর্তের জন্য ভেসে উঠল। তার চোখে জল, কিন্তু মুখে এক নারকীয় প্রতিশোধের হাসি।
​ (পরবর্তী পর্বের জন্য):
​বেজমেন্টে এমন কী ভয়াবহ দৃশ্য অপেক্ষা করছে?অবন্তী কি অমির এই অশরীরী প্রেম থেকে মুক্তি পাবে, নাকি সেও এই প্রতিশোধের আগুনে জ্বলে খাক হবে?
​আসছে পরবর্তী.....

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ছায়াশরীর: ধমনীতে কালীগঞ্জ (পর্ব ৬)

ছায়াশরীর: শ্মশানের মৌন সাক্ষী (পর্ব ৭)

রক্ত ছাড়া কথা বলে না কালীগঞ্জের মাটি: অভিশপ্ত মাইলের দ্বিতীয় অধ্যায়