আত্মার প্রেম — পর্ব: ০১ | ভৌতিক ও রোমান্টিক গল্প

​আত্মার প্রেম : 



শহরের অভিজাত এলাকা 'গুলশান ভ্যালি'। আজ এই এলাকার সবচেয়ে ক্ষমতাধর মানুষ, প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা আকমল খন্দকারের একমাত্র মেয়ে অবন্তীর বিয়ে। রাস্তার মোড় থেকে শুরু করে বাড়ির সদর দরজা পর্যন্ত কয়েক হাজার মরিচবাতি জ্বলছে। বাড়ির সামনে দামি দামি গাড়ির বহর। শহরের নামকরা মন্ত্রী-এমপিরা আজ এখানে আমন্ত্রিত।

​কিন্তু দোতলার বিশাল বারান্দায় কনের সাজে পাথরের মতো বসে আছে অবন্তী। পরনে দামী লাল বেনারসি, গলায় হিরের নেকলেস। সাজগোজে কোনো কমতি নেই, শুধু চোখের নিচে কালিটা মেকআপ দিয়েও ঢাকা যাচ্ছে না। অবন্তী বারবার তার কাঁপা হাতের দিকে তাকাচ্ছে। সেখানে মেহেদির কারুকাজ করা, কিন্তু কেন যেন তার মনে হচ্ছে মেহেদি থেকে কাঁচা রক্তের গন্ধ আসছে।

​অবন্তীর মনে পড়ে যাচ্ছে তিন মাস আগের সেই বৃষ্টিভেজা বিকেলের কথা।

​অমি ছিল কলেজের মেধাবী ছাত্রনেতা। সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে হয়েও সে আকমল খন্দকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্যাম্পাসে আওয়াজ তুলেছিল। আর সেই প্রতিবাদের মাঝেই অবন্তীর সাথে তার পরিচয়। রাজনীতি আর আদর্শের লড়াইয়ের মাঝে কখন যে প্রেম ঢুকে পড়েছিল, কেউ টেরই পায়নি। কিন্তু খবরটা আকমল খন্দকারের কানে পৌঁছাতে সময় লাগেনি।

​তিনি অমিকে একদিন তার খাস কামরায় ডেকেছিলেন। দামী চুরুটের ধোঁয়া অমির মুখের ওপর ছেড়ে বলেছিলেন, "শোন ছেলে, রাজনীতিতে দুই ধরণের মানুষ টেকে। এক যারা ভয় পায়, আর দুই যাদের কেনা যায়। তোর দাম কত?"

​অমি শান্ত স্বরে জবাব দিয়েছিল, "আমার আদর্শ কেনা যায় না স্যার, আর অবন্তীর প্রতি আমার ভালোবাসা কোনো দর কষাকষির বিষয় নয়।"

​সেদিন আকমল খন্দকার কোনো রাগ দেখাননি, শুধু ক্রুর হেসেছিলেন। তার ঠিক সাত দিন পর থেকে অমি নিখোঁজ। পুলিশ কেস হয়েছিল, কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাবে সেটা ধামাচাপা পড়ে যায়। অবন্তীকে বলা হয়েছিল অমি টাকার বিনিময়ে শহর ছেড়ে বিদেশে পালিয়ে গেছে। কিন্তু অবন্তীর মন সেটা মানেনি।

​আজ বাসর ঘরে অবন্তী একা। তার স্বামী সায়েম—যে নিজেও এক প্রভাবশালী নেতার ছেলে—নিচে অতিথিদের বিদায় জানাচ্ছে। হঠাৎ ঘরের বাতাসের তাপমাত্রা হুট করে নেমে গেল। অবন্তী অনুভব করল তার গলার হিরের নেকলেসটা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। এসি বন্ধ, অথচ জানলার পর্দাগুলো এমনভাবে দুলছে যেন বাইরে কালবৈশাখী ঝড় হচ্ছে।

​হঠাৎ দরজায় করাঘাত। খট... খট... খট...

​সায়েম কি এল? অবন্তী কোনোমতে বলল, "ভেতরে আসুন।"

​কিন্তু দরজাটা খোলার কোনো শব্দ হলো না। অথচ ঘরের বড় আয়নাটার ওপর ধীরে ধীরে একটা বাষ্পের আস্তরণ জমে গেল। অবন্তী অবাক হয়ে দেখল, সেই বাষ্পের ওপর কেউ আঙুল দিয়ে লিখছে।

​"আমি আসিনি অবন্তী, আমাকে আনা হয়েছে।"

​অবন্তী আতঙ্কে চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনো স্বর বের হলো না। ঠিক তখনই নিচতলা থেকে এক বিকট আর্তনাদ ভেসে এল। শব্দটা তার বাবা আকমল খন্দকারের। অবন্তী কোনোমতে ঘর থেকে বেরিয়ে দৌড়ে নিচে নামল। ড্রয়িংরুমে গিয়ে যা দেখল, তাতে উপস্থিত সবার রক্ত হিম হয়ে গেল।

​বিশাল হলরুমের মাঝখানে আকমল খন্দকার পড়ে আছেন। তার পরনের সাদা পাঞ্জাবিটা ভিজে লাল হয়ে গেছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তাকে কেউ কোনো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করেনি। তার সারা শরীরে কামড়ের দাগ, যেন কোনো হিংস্র পশু তাকে আক্রমণ করেছে। তিনি গোঙাতে গোঙাতে শুধু একটা দিকে ইশারা করলেন।

​দেওয়ালের বড় ঘড়িটার দিকে সবাই তাকাল। ঘড়িটার কাঁটাগুলো অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে উল্টো দিকে ঘুরছে। আর ঘড়ির টিক-টিক শব্দের বদলে ভেসে আসছে একটা চেনা শিসের শব্দ। যে শিসটা অমি দিত অবন্তীর জানালার নিচে দাঁড়িয়ে।

​হঠাৎ হলের সব আলো নিভে গেল। ঘুটঘুটে অন্ধকারের মাঝে শোনা গেল এক জোড়া ভারী পায়ের শব্দ। খট... খট... খট...

​সেই শব্দের সাথে ভেসে এল অমির সেই শান্ত অথচ শীতল কণ্ঠস্বর— "রাজনীতিতে যেমন গদি ছাড়তে হয়, তেমনি জীবনের হিসাবও চুকিয়ে দিতে হয়। আজ প্রথম কিস্তি শোধ করলাম, আকমল সাহেব।"

​হঠাৎ আলো ফিরল। দেখা গেল আকমল খন্দকার নেই! মেঝের যেখানে তিনি পড়েছিলেন, সেখানে শুধু একটা পুরনো, কাদা মাখা সস্তা চটি জুতো পড়ে আছে। যে জুতোটা অমি পরত।

​অবন্তী টলতে টলতে বাসর ঘরে ফিরে এল। দেখল সায়েম সেখানে বসে আছে, কিন্তু তার মুখটা দেওয়ালের দিকে ফেরানো। অবন্তী কাঁপা গলায় ডাকল, "সায়েম? তুমি ঠিক আছ?"

​সায়েম ধীরে ধীরে ঘাড় ঘোরাল। অবন্তী দেখল সায়েমের শরীরে কোনো প্রাণ নেই, তার চোখ দুটো উপড়ে ফেলা হয়েছে। আর সায়েমের গলার ভেতর থেকে অমির কণ্ঠস্বর বেরিয়ে এল— "বাসর রাতের উপহারটা কেমন লাগল অবন্তী? আরও তো বাকি আছে..."

​(পরবর্তী পর্ব):

​আকমল খন্দকার কোথায় অদৃশ্য হলেন? অমির আত্মা কি সায়েমকে মেরে ফেলেছে নাকি তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে? আর অমির প্রকৃত খুনি কে? আকমল খন্দকার নাকি পর্দার আড়ালে থাকা অন্য কেউ?

​আসছে পরবর্তী পর্বে...

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ছায়াশরীর: ধমনীতে কালীগঞ্জ (পর্ব ৬)

ছায়াশরীর: শ্মশানের মৌন সাক্ষী (পর্ব ৭)

রক্ত ছাড়া কথা বলে না কালীগঞ্জের মাটি: অভিশপ্ত মাইলের দ্বিতীয় অধ্যায়