ছায়াশরীর: ধমনীতে কালীগঞ্জ (পর্ব ৬)
ছায়াশরীর: ধমনীতে কালীগঞ্জ
ছায়াশরীর
পর্ব ৬: অভিশপ্ত উত্তরাধিকার
ঘরের কোণে রাখা সেই পৈশাচিক মেমোরি কার্ডটি থেকে নির্গত নীলচে ধোঁয়া এখন ঘরের সিলিং ছুঁয়ে এক কালচে মেঘের আস্তরণ তৈরি করেছে। অয়ন লক্ষ্য করল, সেই ধোঁয়া যেন স্থির নেই; ওটা ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে একটি অস্পষ্ট মানবেতর অবয়ব ধারণ করার চেষ্টা করছে। কিন্তু তার চেয়েও বেশি হাড়হিম করা দৃশ্য হলো দেয়ালের ওপর অয়নের নিজের ছায়াটা। লণ্ঠনের ম্লান আলোয় সেই ছায়াটা এখন আর অয়নের শারীরিক নড়াচড়াকে অনুসরণ করছে না। অয়ন ভয়ে হাত তুললে ছায়াটা মূর্তির মতো স্থির থাকছে, অয়ন হাপিত্যেশ করে নিশ্বাস নিলে দেয়ালের সেই কালো অবয়বটা যেন পৈশাচিক উল্লাসে বুক ফুলিয়ে ফুঁসছে। নিজের অস্তিত্বের এই পৈশাচিক বিভাজন অয়নকে এক অসহ্য মানসিক যন্ত্রণার অতল গহ্বরে ঠেলে দিল।
সে পাগলের মতো তার বাবার সেই ধুলোমাখা, জরাজীর্ণ ডায়েরিটা আবার বুকের সাথে জাপ্টে ধরল। হলদেটে পাতার ওপর বাবার পরিচিত সেই কাটাকাটা হাতের লেখাগুলো এখন তার কাছে অন্ধকারের গোলকধাঁধায় একমাত্র ধ্রুবতারা। ডায়েরির ঠিক মাঝখানের একটি পাতা অন্যগুলোর চেয়ে বেশি খসখসে এবং কালচে। সেখানে অয়ন দেখল এক হাতে আঁকা অদ্ভুত নকশা—একটি প্রাচীন বৃত্ত, যার ভেতরে একটি রক্তবর্ণ চোখ আঁকা। তার নিচে বাবার কাঁপাকাঁপা হরফে লেখা ছিল কিছু বাক্য, যা অয়নের রক্ত হিম করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট:
"ছায়াশরীররা কেবল মানুষকে শারীরিকভাবে মারে না, তারা মানুষকে ভেতর থেকে প্রতিস্থাপন করে। যখন তুমি দেখবে তোমার নিজের ছায়া তোমার অবাধ্য হচ্ছে, জানবে তোমার সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। এই সংক্রমণের নিরাময় কেবল শুরুতেই সম্ভব, আর সেই শুরু লুকিয়ে আছে তোমার নিজের ধমনীর রক্তে।"
অয়ন স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। বাবার এই রহস্যময় সতর্কবার্তার গুঢ় অর্থ কী? বাবা কি তবে আগে থেকেই জানতেন যে অয়ন কোনোদিন এই অলৌকিক মরণফাঁদে পা দেবে? হঠাৎ তার স্মৃতিপটে ভেসে উঠল বহু বছর আগের এক আবছা দৃশ্য। অয়ন তখন খুব ছোট, বাবা তাকে নিয়ে একবার কালীগঞ্জের কাছাকাছি এক ঘন জঙ্গলঘেরা জনমানবহীন গ্রামে গিয়েছিলেন। সেখানে এক জরাজীর্ণ কুঁড়েঘরে এক বৃদ্ধ তান্ত্রিক অয়নের ডান হাতের তালুতে একটা কালচে, পিচ্ছিল পাথরের টুকরো ঘষে দিয়েছিলেন। বাবা সেদিন বলেছিলেন, ওটা একটা আজীবনের রক্ষাকবচ। কিন্তু সেই পাথরটা এখন কোথায়? গত বিশ বছরে অয়ন সেটার কথা ভুলেই গিয়েছিল।
ঠিক তখনই বন্ধ দরজার বাইরে থেকে আবার সেই ছন্দময় শব্দটা ভেসে এল— 'ঠক... ঠক... ঠক'। কিন্তু এবার আর দরজার নিচ দিয়ে সেই কালো তৈলাক্ত তরল আসছে না। পরিবর্তে অয়ন শুনতে পেল তার নিজের গর্ভধারিণী মায়ের কণ্ঠস্বর।
"অয়ন, দরজাটা খোল বাবা। তুই অনেকক্ষণ না খেয়ে আছিস, তোর জন্য তোর প্রিয় গরম ভাত আর ইলিশ মাছ নিয়ে এসেছি।"
অয়নের গায়ের পশম মুহূর্তেই খাড়া হয়ে গেল। এক তীব্র আতঙ্ক তার মস্তিষ্ককে অবশ করে দিল। তার মা তো আজ থেকে পাঁচ বছর আগেই দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভুগে পরলোকগমন করেছেন! তবে এই অবিকল কণ্ঠস্বর কোথা থেকে আসছে? সে জানত, এটা সেই ছায়াশরীরদের মায়া। তারা তার অবচেতন মনের গভীরতম এবং দুর্বলতম স্মৃতিগুলোকে এখন তার বিরুদ্ধে মারণাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। সে নিজের দুই কানে হাত চেপে ধরে চিৎকার করে বলতে লাগল, "তুই আমার মা নোস! তুই ওই তেরো মাইলের অন্ধকারের অংশ! চলে যা এখান থেকে!"
বাইরে থেকে আসা সেই স্নেহময়ী মায়ের কণ্ঠস্বর মুহূর্তেই বদলে গেল এক বীভৎস, কর্কশ পৈশাচিক অট্টহাসিতে। "কতক্ষণ নিজেকে এই চার দেয়ালের ভেতর বন্দি করে রাখবি অয়ন? তুই তো জানিস না, তোর ভেতরে যে কালীগঞ্জ সুপ্ত ছিল, সেটা অলরেডি জেগে উঠেছে। তুই চাস বা না চাস, তুই আমাদেরই একজন হতে চলেছিস।"
অয়ন ডায়েরির পরবর্তী পাতায় হাত বোলাতেই এক চাঞ্চল্যকর এবং রোমহর্ষক তথ্য পেল। সেখানে লেখা আছে, কালীগঞ্জের এই অভিশাপ কোনো ভৌগোলিক সীমানায় বা তেরো মাইলের রাস্তায় আটকে থাকে না; এটি একটি বংশগত ভাইরাসের মতো ধমনীতে প্রবাহিত হয়। অয়নের দাদা ছিলেন সেই কুখ্যাত জমিদার বাড়ির এক অত্যন্ত বিশ্বস্ত কর্মচারী, যিনি সেই অগ্নিকাণ্ডের অভিশপ্ত রাতে অলৌকিকভাবে পালিয়ে বেঁচেছিলেন। কিন্তু তিনি সেদিন একা ফিরে আসেননি; তিনি তার ছায়ার সাথে এক অবিনাশী অশরীরীকে বহন করে নিয়ে এসেছিলেন লোকালয়ে। সেই সুপ্ত অভিশাপই আজ বিশ বছর পর অয়নের রক্তে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে।
অয়ন এখন পরিষ্কার বুঝতে পারল, আসিফ তাকে শুধু মেমোরি কার্ড বা নিউজের জন্য কালীগঞ্জে পাঠায়নি। আসিফ জানত অয়নের পারিবারিক ইতিহাসের এই অন্ধকার অধ্যায়ের কথা। আসিফ অয়নকে ব্যবহার করেছে এক জ্যান্ত 'চাবি' হিসেবে। অয়নের রক্তই হলো সেই প্রাচীন চাবি, যা দিয়ে কালীগঞ্জের সেই বন্ধ হয়ে যাওয়া শয়তানি তোরণ আবার চিরকালের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া সম্ভব।
উন্মাদপ্রায় অয়ন তার ঘরের আলমারির একদম নিচের গোপন ড্রয়ারটা কুড়াল দিয়ে ভেঙে ফেলল। সেখানে একটা পুরনো রুপোর কাজ করা বাক্সে অতি যত্নে রাখা ছিল সেই কালচে পাথরটা। পাথরটা হাতে নেওয়া মাত্রই অয়ন এক তীব্র বৈদ্যুতিক ঝটকা অনুভব করল। তার হাতের তালু থেকে এক অদ্ভুত নীল রঙের আভা বের হতে লাগল। দেয়ালের ওপর যে বিদ্রোহী ছায়াটা এতক্ষণ তাকে বিদ্রুপ করছিল, সেটা এবার যেন এক অদৃশ্য যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যেতে শুরু করল।
অয়ন বুঝতে পারল, তাকে এখন আর এই চার দেয়ালের ভেতর লুকিয়ে থাকলে চলবে না। তাকে ফিরে যেতে হবে সেই শহরেই, যেখানে তার পূর্বপুরুষদের শেষ ইতিহাস মাটির নিচে লুকানো আছে। শহরের প্রান্তসীমায় যে প্রাচীন শ্মশানঘাট রয়েছে, সেখানে অয়নের দাদার একটা ছোট নামফলকহীন স্মৃতিসৌধ আছে। অয়ন জানত, সেখানে কোনো এক চূড়ান্ত সংকেত বা হাতিয়ার তার জন্য অপেক্ষা করছে।
সে জানালার ভারী পর্দাটা সরিয়ে সাবধানে একবার বাইরে তাকাল। যা দেখল, তাতে তার চোখ কপালে উঠল। রাস্তার প্রতিটি মানুষ—পারশবর্তী ফ্ল্যাটের রকিব কাকা, মোড়ের চা-ওয়ালা শওকত, এমনকি গভীর রাতে ডিউটি করা সিএনজি ড্রাইভার—সবাই মূর্তির মতো স্থির হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। তারা সবাই ঘাড় উঁচু করে অয়নের জানালার দিকে পলকহীন চোখে চেয়ে আছে। আর সবচাইতে ভয়ানক ব্যাপার হলো, তাদের প্রত্যেকের হাতে একটি করে জ্বলন্ত প্রাচীন লণ্ঠন। পুরো ঝলমলে শহরটা যেন এক নিমেষেই কালীগঞ্জের সেই নির্জন, অভিশপ্ত গ্রামে রূপান্তরিত হয়ে গেছে।
অয়ন দ্রুত তার ব্যাগ গুছিয়ে নিল। তার সাথে এখন কেবল বাবার সেই ডায়েরি, কালচে পাথর আর লেন্স ভাঙা ক্যামেরাটা। সে জানত, লেন্স ভাঙলেও ক্যামেরার ডিজিটাল সেন্সরে এমন কিছু অলৌকিক দৃশ্য রেকর্ড হয়েছে যা খালি চোখে দেখা কস্মিনকালেও সম্ভব নয়।
সে যখন প্রধান দরজাটা খুলল, পুরো করিডোরটা ঘন কুয়াশায় ঢাকা। কিন্তু সেই কুয়াশার ভেতরে সে দেখতে পেল হাজার হাজার কালো ছায়া তার জন্য দুপাশে সরে গিয়ে পথ করে দিচ্ছে। তারা তাকে আক্রমণ করতে চায় না, তারা যেন তাদের নতুন রাজাকে স্বাগত জানাচ্ছে। অয়ন সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে নামতে অনুভব করল, তার স্বাভাবিক হৃদস্পন্দন ক্রমশ মন্থর হয়ে আসছে, আর তার শরীরের তপ্ত রক্ত ধীরে ধীরে বরফের মতো শীতল হয়ে যাচ্ছে।
সে কি তবে ক্রমশ মানুষ থেকে এক ছায়াশরীরে পরিণত হচ্ছে? নাকি এই অনিবার্য পরিবর্তনই তাকে এই আদিম অভিশাপ থেকে মুক্তির কোনো গোপন পথ বাতলে দেবে? অয়ন যখন তার গাড়িতে গিয়ে বসল এবং ইঞ্জিন স্টার্ট দিল, রিয়ার ভিউ মিররে চোখ পড়তেই দেখল—তার পেছনের সিটে আসিফ বসে নেই, বসে আছে তার সেই হারানো শৈশবের মা। মা তার দিকে তাকিয়ে এক ম্লান, করুণ হাসলেন এবং শীতল কণ্ঠে বললেন, "গাড়ি স্টার্ট দে অয়ন, আমাদের গন্তব্য এখনও অনেক দূর। তেরো মাইল তো কেবল শুরু ছিল, আসল পথ তো এখন শুরু হবে।"
(৬ষ্ঠ পর্ব সমাপ্ত)
পরবর্তী (৭ম) পর্বে যা ঘটবে:
অয়ন পৌঁছাবে সেই কুয়াশাচ্ছন্ন প্রাচীন শ্মশানঘাটে। সেখানে সে আবিষ্কার করবে যে তার বাবার মৃত্যু কোনো দুর্ঘটনা ছিল না। আর সেই কালচে পাথরটা আসলে কোনো সাধারণ পাথর নয়, ওটা ছিল কালীগঞ্জের জমিদার বাড়ির প্রধান ফটকের এক টুকরো অভিশপ্ত অংশ। শহরের সাধারণ মানুষগুলো কেন লণ্ঠন হাতে রাস্তায় অয়নকে পাহারা দিচ্ছে? তারা কি অয়নের শেষ রক্ষার দূত, নাকি তাকে যমপুরীতে পৌঁছে দেওয়ার প্রহরী?
গল্পটি ভালো লাগলে অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন